আন্তর্জাতিক

অরুণাচল সীমান্তে চীনা সেনাদের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ, কী বলছে ভারত সরকার?

ভারতের অরুণাচল প্রদেশের চীন সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) ঘিরে দুই দেশের সেনাদের অবস্থান ও মুখোমুখি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সম্প্রতি ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এক শীর্ষ কর্মকর্তার বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল জানিয়েছেন, সীমান্তে অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান এবং ভুল-বোঝাবুঝি এড়াতে ভারত ও চীন কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চীনা বাহিনী নির্ধারিত টহলপদ্ধতি থেকে সরে এলে সীমান্ত পরিস্থিতি মাঝেমধ্যে অশান্ত হয়ে ওঠে।

সীমান্তে ৬–৭ কিলোমিটার ভেতরে চীনা সেনাদের অবস্থানের দাবি

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে সরকারি সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, অরুণাচল প্রদেশের টাকসিং এলাকার কাছে আসাফিলা অঞ্চলে ভারত ও চীনের সেনারা কয়েক মাস ধরে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাইয়ের শেষ দিকে নিয়মিত টহলের সময় দুই দেশের সেনাদের মধ্যে মুখোমুখি পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে চীনা সেনারা আবার ওই এলাকায় ফিরে এসে তাঁবু স্থাপন করে বলে দাবি করা হয়েছে। ভারতের ধারণা করা নিয়ন্ত্রণরেখার ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার ভেতরে তাদের অবস্থানের অভিযোগও উঠেছে।

তবে এই অবস্থানের সুনির্দিষ্ট সীমারেখা ও পরিস্থিতি নিয়ে দুই দেশের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ, যৌথভাবে যাচাইকৃত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে চীনা সেনারা ঠিক কতটা ভেতরে অবস্থান করছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বক্তব্যে নতুন বিতর্ক

ভারতের ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ (আইটিবিপি)-এর মহাপরিচালক শত্রুজিৎ সিং কাপুর জানিয়েছেন, অরুণাচল সীমান্তের কয়েকটি স্থানে চীনা বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি পরিস্থিতিতে ভারতীয় কমান্ডোরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।

তিনি আরও বলেন, আইটিবিপির ব্যবহৃত কিছু অস্ত্র প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো। বর্তমান পরিস্থিতিতে সীমান্ত সুরক্ষায় আধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন।

বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তি, আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম এবং উচ্চ পার্বত্য এলাকায় যুদ্ধের উপযোগী অবকাঠামো তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। আগামী তিন বছরে চীন সীমান্তে ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্র বা বাঙ্কার তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

মোদি সরকারের ওপর বিরোধীদের চাপ

সীমান্ত পরিস্থিতি এবং আইটিবিপি প্রধানের বক্তব্যের পর ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করেছে। দলটির নেতা জয়রাম রমেশের অভিযোগ, চীনের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যার বিষয়ে সরকার যথেষ্ট স্বচ্ছতা দেখাচ্ছে না।

তবে ভারত সরকার জানিয়েছে, সীমান্তে শান্তি বজায় রাখতে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে একাধিক বৈঠক হলেও বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোর স্থায়ী সমাধান এখনো হয়নি।

বাণিজ্য বাড়লেও কমেনি সীমান্তের অস্বস্তি

সীমান্ত নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যেও ভারত ও চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি থেমে নেই। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১৮ দশমিক ৩১ শতাংশ বেড়ে ১৫১ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল।

অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়লেও সীমান্তে আস্থা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন এখনো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

সামগ্রিকভাবে, অরুণাচল সীমান্তের পরিস্থিতি ভারত-চীন সম্পর্কের একটি সংবেদনশীল অধ্যায়। দুই দেশের মধ্যে চলমান আলোচনা উত্তেজনা কমাতে কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি, পারস্পরিক আস্থা এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বাস্তব অগ্রগতির ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *