বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কি পুরোনো নির্ভরতার বৃত্ত ভেঙে নতুন বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে? জাপান-তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কের অগ্রাধিকার, আর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ—এই দুইয়ের মাঝখানেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের আগামী দিনের কূটনৈতিক অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
আমার বয়ান স্পষ্ট—বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো দেশের অনুগ্রহনির্ভর হতে পারে না। এটি হতে হবে জনগণের প্রত্যাশা, রাষ্ট্রের মর্যাদা এবং জাতীয় স্বার্থের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
ভারত বাংলাদেশের প্রতিবেশী। ভৌগোলিক বাস্তবতায় ভারতকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রতিবেশী বলেই সব বিষয়ে একমত হতে হবে, কিংবা সম্পর্ক ভালো রাখার জন্য বাংলাদেশের ন্যায্য দাবিগুলোকে আড়াল করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই।
সীমান্তে প্রাণহানি, অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা, বাণিজ্যিক বৈষম্য এবং পারস্পরিক আস্থার সংকট এসব প্রশ্নের সমাধান ছাড়া সম্পর্কের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। বন্ধুত্বের দাবি তখনই অর্থবহ হয়, যখন দুই পক্ষই একে অপরের স্বার্থ ও মর্যাদাকে সমান গুরুত্ব দেয়।
জাপান বাংলাদেশের উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে। তুরস্কের সঙ্গে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। একইভাবে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন।
কিন্তু এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য মনে রাখতে হবে বিকল্প অংশীদার খোঁজা মানে এক দেশকে সরিয়ে অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল হওয়া নয়; বরং এমন সক্ষমতা তৈরি করা, যাতে বাংলাদেশ নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের কূটনীতি সেই সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে কি না, সেটিই হবে বড় পরীক্ষা। কোন দেশ আগে সফরের তালিকায় এলো, আর কোন দেশ পরে শুধু তা দিয়ে পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য বিচার করা যায় না। বিচার করতে হবে সফরগুলো থেকে বাংলাদেশ কী পেল, কোন জাতীয় স্বার্থ এগিয়ে গেল এবং দেশের মানুষের জীবনে তার বাস্তব প্রভাব কতটা পড়ল।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রযোজ্য। বাংলাদেশ যেমন ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা চায়, তেমনি চায় ন্যায্যতা। যেমন শান্তিপূর্ণ প্রতিবেশী সম্পর্ক চায়, তেমনি চায় পারস্পরিক সম্মান। বাংলাদেশের স্বার্থে যেখানে সহযোগিতা প্রয়োজন, সেখানে সহযোগিতা হবে; আর যেখানে ন্যায্য অধিকার ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন, সেখানে যুক্তি ও দৃঢ়তার সঙ্গে অবস্থান নিতে হবে।
আমার প্রশ্ন তাই শুধু ভারত কেন পরে? নয়। আমার প্রশ্ন আরও গভীর—বাংলাদেশ কি এবার এমন এক পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের উষ্ণতা দিয়ে নয়, বাংলাদেশের অর্জন দিয়ে সাফল্য মাপা হবে?
আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের সামনে সেই সুযোগ রয়েছে। তবে তার জন্য প্রয়োজন আবেগনির্ভর অবস্থানের পরিবর্তে বাস্তববাদী কূটনীতি, ব্যক্তিনির্ভর সম্পর্কের পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি এবং সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা।
আমাদের মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রের বন্ধুত্ব স্থায়ী হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের স্বার্থকে কখনোই অস্পষ্ট রাখা যায় না।
বাংলাদেশ ভারতের শত্রু নয়, জাপানের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, তুরস্কের অনুসারীও নয়। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তার নিজস্ব স্বার্থ, নিজস্ব সিদ্ধান্ত এবং নিজস্ব ভবিষ্যৎ রয়েছে।
তারেক রহমানের কূটনীতির সাফল্য নির্ধারিত হবে এই স্বাধীন অবস্থান কতটা বাস্তবে রূপ নেয়, তার ওপর।
আমার বয়ানের শেষ কথা
ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই, কিন্তু ন্যায্যতার ভিত্তিতে। জাপান-তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা চাই, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের শর্তে। বিশ্বের সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক চাই, কিন্তু বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের প্রশ্নে কোনো আপস নয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে কোনো বিদেশি রাজধানী নয় থাকতে হবে ঢাকা, বাংলাদেশের মানুষ এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ।
কারণ বাংলাদেশ কারও ছায়া হয়ে বাঁচতে চায় না; বাংলাদেশ নিজের শক্তিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায়।
সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, সবার সঙ্গে সহযোগিতা কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থ সবার আগে। এটাই হওয়া উচিত নতুন বাংলাদেশের কূটনৈতিক দর্শন।

