আমার বয়ান

লাখ লাখ হকার-অটো, কোটি কোটি টাকার ক্ষতি—চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির দায় কার?

আমাদের দেশে লাখ লাখ মানুষ ফুটপাতে ব্যবসা করেন, লাখ লাখ অটোরিকশা রাস্তায় চলে। একদিকে মানুষের জীবিকার সংগ্রাম, অন্যদিকে যানজট, জনদুর্ভোগ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়। কিন্তু এই সমস্যার পেছনে শুধু হকার বা অটোরিকশাচালকদের দেখলে পুরো চিত্রটা বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, অব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহির প্রশ্ন।

একজন হকার ফুটপাতে বসেন জীবিকার তাগিদে। একজন অটোরিকশাচালক রাস্তায় নামেন পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে। কিন্তু তাঁদের এই অসহায়ত্বকে পুঁজি করে কেউ যদি নিয়মিত চাঁদা আদায় করে, অবৈধ দখল টিকিয়ে রাখে কিংবা টাকার বিনিময়ে নিয়ম ভাঙার সুযোগ দেয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—লাভবান হচ্ছে কে?

ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান হয়, যানবাহন নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা আসে। কিন্তু চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক, অবৈধ লেনদেন এবং অনিয়মের পেছনে যাঁরা জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? শুধু ছোট ব্যবসায়ী কিংবা চালককে সরিয়ে দিলে সমস্যার মূল কি দূর হবে?

আমার কথা পরিষ্কার—হকারের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়া অন্যায়, অটোরিকশাচালকের কাছ থেকে জোর করে টাকা আদায় অপরাধ, আর এসবের পেছনে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা চক্র জড়িত থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। অভিযোগ যার বিরুদ্ধেই উঠুক, তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ এবং প্রমাণের ভিত্তিতে।

একই সঙ্গে হকারদের জন্য নির্দিষ্ট ব্যবসার জায়গা, অটোরিকশার পরিকল্পিত রুট, স্বচ্ছ লাইসেন্সব্যবস্থা এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ মানুষকে বিকল্প না দিয়ে উচ্ছেদ করা যেমন স্থায়ী সমাধান নয়, তেমনি জীবিকার নামে জনপথ দখল ও নাগরিকের অধিকার ক্ষুণ্ন করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

রাষ্ট্রের ক্ষতি শুধু কোটি কোটি টাকার হিসাব নয়। যানজটে নষ্ট হচ্ছে মানুষের কর্মঘণ্টা, বাধাগ্রস্ত হচ্ছে জরুরি সেবা, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসা এবং কমছে শহরের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা। এর সঙ্গে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি যুক্ত হলে ক্ষতির বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাঁধেই পড়ে।

আমি এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে গরিব মানুষ সম্মানের সঙ্গে জীবিকা নির্বাহ করবেন, নাগরিক নির্বিঘ্নে চলাচল করবেন এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদকে ব্যক্তিগত আয়ের উৎস বানাতে পারবে না।

দেশটা কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। ফুটপাত কারও চাঁদা তোলার জায়গা নয়, রাস্তাও কারও অবৈধ আয়ের মাধ্যম নয়। গরিবের জীবিকার অধিকার রক্ষা করতে হবে, নাগরিকের চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, আর দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে—অপরাধীর পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে।

মনে রাখতে হবে, শুধু হকার উচ্ছেদ করে শহর পরিষ্কার করা যায়, কিন্তু দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির শিকড় অক্ষত রেখে রাষ্ট্রকে সুশৃঙ্খল করা যায় না। পরিবর্তন চাইলে দৃশ্যমান সমস্যার পাশাপাশি আড়ালে থাকা স্বার্থেরও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আইন যদি শুধু দুর্বল মানুষের ওপর প্রয়োগ হয়, আর প্রভাবশালীরা ছাড় পায়, তাহলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে না। রাষ্ট্রের শক্তি উচ্ছেদ অভিযানে নয়—রাষ্ট্রের শক্তি হলো অন্যায় বন্ধ করা, দুর্নীতি রোধ করা এবং সবার জন্য আইন সমানভাবে কার্যকর করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *