আমার বয়ান

ইশরাক হোসেনকে ঘিরে প্রশ্ন: রাজনৈতিক ত্যাগ কি এত সহজেই ভুলে যাই?

ইশরাক হোসেনকে নিয়ে আজ যারা প্রশ্ন তুলছেন, তারা কি তাঁর অতীতের রাজনৈতিক ত্যাগ আর দলের প্রতি নিবেদনের কথাও মনে রেখেছেন?

রাজনীতিতে কাউকে অন্ধভাবে সমর্থন করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু একটি ঘটনা ঘটলেই একজন মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভূমিকা, দলের প্রতি তাঁর আনুগত্য এবং কর্মীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক—সবকিছু ভুলে যাওয়াকেও আমি সমর্থন করতে পারি না।

ইশরাক হোসেনকে নিয়ে আলোচনা হোক, সমালোচনা হোক। কোনো ভুল হয়ে থাকলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত হোক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একটি ঘটনা সামনে আসার পরই কি একজন নেতাকে এমনভাবে কোণঠাসা করতে হবে, যেন অতীতে তাঁর কোনো অবদানই ছিল না?

আমরা কি রাজনীতিতে মানুষের অবদান মনে রাখি, নাকি যতদিন প্রয়োজন ততদিনই মানুষকে মূল্যায়ন করি?

একটি দলের জন্য একজন নেতার ত্যাগ শুধু তাঁর নিজের বিষয় নয়। তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে থাকেন অসংখ্য কর্মী, সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষী। তাঁদের আবেগ, বিশ্বাস এবং দীর্ঘদিনের সম্পর্কও রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ। তাই কোনো নেতাকে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পুরো বিষয়টি বিবেচনা করা জরুরি।

তবে এটাও সত্য, অতীতের ত্যাগ কাউকে সব প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখতে পারে না। দলের প্রতি আনুগত্যের অর্থ অন্যায়কে সমর্থন করা নয়। আবার সমালোচনা করার অধিকার আছে বলেই কাউকে অসম্মান করা কিংবা প্রমাণের আগেই দোষী সাব্যস্ত করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

আমার আপত্তি এখানেই—বিচার হোক ঘটনার, কিন্তু একটি ঘটনাকে অজুহাত করে একজন মানুষের পুরো রাজনৈতিক পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা যেন না হয়।

রাজনীতিতে সুসময় এলে অনেকেই পাশে দাঁড়ান। কিন্তু কঠিন সময়ে কে পাশে থাকেন, কে অতীতের অবদান মনে রাখেন, আর কে পরিস্থিতি বুঝে অবস্থান বদলে ফেলেন—সেটাই রাজনৈতিক চরিত্রের আসল পরীক্ষা।

ইশরাক হোসেন সঠিক না ভুল, তা নির্ধারণ হোক তথ্য, যুক্তি ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে। কিন্তু কোনো নেতাকে নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনার বাস্তবতা—দুটিই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

কারণ, আজ একজন নেতার প্রতি অন্যায় হলে কাল একই রাজনৈতিক সংস্কৃতির শিকার অন্য কেউ হতে পারেন। তখন প্রতিবাদ করার নৈতিক শক্তিটুকুও হয়তো আমাদের থাকবে না।

আমরা এমন রাজনীতি চাই, যেখানে ভুল করলে জবাবদিহি করতে হবে, কিন্তু অবদান রাখলে তার স্বীকৃতিও থাকবে। যেখানে সমালোচনা থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসা নয়; মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু অকৃতজ্ঞতা নয়।

আমার বক্তব্য পরিষ্কার—কাউকে দেবতা বানানোর প্রয়োজন নেই, আবার একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁকে একেবারে মুছে ফেলার চেষ্টাও কাম্য নয়। রাজনীতিতে মানুষকে বিচার করতে হবে ন্যায়বিচার দিয়ে, সুবিধা-অসুবিধার হিসাব দিয়ে নয়।

প্রশ্নটা শুধু ইশরাক হোসেনকে নিয়ে নয়; প্রশ্নটা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে। আমরা কি আদর্শের রাজনীতি করছি, নাকি প্রয়োজন শেষ হলে মানুষকে ভুলে যাওয়ার রাজনীতি করছি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *